গাজল, ১৫ অক্টোবর: শারদোৎসবের আবহে মেতে উঠেছে বাংলা। চারদিকে দুর্গাপুজোর আনন্দ। কিন্তু মালদহের গাজলের ময়না এলাকার মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় উৎসব বিষহরি ঠাকুরানির পুজো ও মেলা। এই উৎসবের জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন এলাকার মানুষ। বৃহস্পতিবার রাতে বিষহরি ঠাকুরানির পুজোকে ঘিরে শুরু হচ্ছে উৎসবের আয়োজন। শুক্রবার সকাল থেকে বসবে মেলা। প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো রীতি মেনে টানা পাঁচ দিন ধরে চলবে পুজো ও মেলা। স্থানীয়দের পাশাপাশি মালদহের বিভিন্ন প্রান্ত এবং দুই দিনাজপুর থেকেও ভিড় জমাবেন অসংখ্য দর্শনার্থী। তবে এই উৎসবের সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু ধর্মীয় ঐতিহ্য নয়, বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য বন্ধন।
গাজল থেকে রায়গঞ্জগামী ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে অবস্থিত বর্ধিষ্ণু এলাকা ময়না। একসময় ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই অঞ্চলে ছিল সাপের প্রচণ্ড উপদ্রব। আতঙ্কে দিন কাটত বাসিন্দাদের। সেই ভয় থেকে মুক্তি পেতে দেবী মনসাকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে পুজোর সূচনা করেন মারনাইয়ের জমিদাররা। সময়ের স্রোত বয়ে গিয়েছে, বদলেছে এলাকার চেহারা। কিন্তু বদলায়নি মানুষের বিশ্বাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই পুজো আজও সমান নিষ্ঠায় পালন করে চলেছেন স্থানীয়রা।
বিষহরি ঠাকুরানি ময়নার মানুষের কাছে মনস্কামনা পূরণের দেবী হিসেবে পরিচিত। তাই কোনও শুভ কাজের আগে অনেকেই মন্দিরে এসে দেবীর আশীর্বাদ নিয়ে যান। এই বিশ্বাসের টান শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বহু মুসলিম মানুষও দেবীর কাছে মানত করেন, পুজো দেন। ডিম ও পায়রা নিবেদন করেও আরাধনা করেন তাঁরা। ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে একই উৎসবে সামিল হন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। বিশ্বাস আর ভক্তির বন্ধনেই ময়নায় যেন বারবার নতুন করে লেখা হয় সম্প্রীতির গল্প।
পুজো কমিটির সম্পাদক সুমন্ত সরকার বলেন, “দুর্গাপুজোর থেকেও এই পুজো ময়না এলাকার মানুষের কাছে বড় উৎসব। সারা বছর মানুষ এই পুজো ও মেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। পুজো উপলক্ষে প্রায় সকলেই ঘরে ফেরেন। দুই সম্প্রদায়ের মানুষই উৎসবে শামিল হয়ে পুজো দেন, প্রার্থনা জানান।”
চারশো বছরের ঐতিহ্য, মানুষের অগাধ বিশ্বাস আর দুই সম্প্রদায়ের মিলন—সব মিলিয়ে ময়নার বিষহরি ঠাকুরানির পুজো শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এ যেন সম্প্রীতি ও মিলেমিশে বেঁচে থাকার এক জীবন্ত পরম্পরা।







